সোমবার রাত থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সশস্ত্র দুর্বৃত্তের দল উখরুল জেলার অন্তর্গত লিতান সারেখং গ্রামের একাধিক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে। যার ফলে পার্বত্য জেলার আতঙ্কিত গ্রামবাসী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী কাংপোকপি জেলার নিরাপদ এলাকায় পালিয়ে গিয়েছেন।
মণিপুরের উখরুল জেলায় নতুন করে সহিংসতার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়া হয়েছে। তৃতীয় দিনেও সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা নাগরিকদের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করার পাশাপাশি জন্য ইন্টারনেট ও ডেটা পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে মণিপুর সরকার। সোশাল মিডিয়ায় প্ররোচিত অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
আজ ১০ ফেব্রুয়ারি মণিপুর সরকারের গৃহ দফতরের জারিকৃত আদেশে বলা হয়েছে, উখরুল জেলার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং ইন্টারনেট পরিষেবার অবাধ ব্যবহারের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, সমাজবিরোধী তথা দুষ্কৃতীরা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নানা ধরনের আপত্তিকর ছবি, উসকানিমূলক মন্তব্য ও ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে প্রাণহানি, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং জনশান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে গুরুতর আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি আদেশে আরও বলা হয়েছে, সোশাল মিডিয়া, মেসেজিং পরিষেবা, এসএমএস এবং ডংগল-ভিত্তিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে উসকানিমূলক উপাদান ও ভুয়ো গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য উখরুল জেলার সমগ্র রাজস্ব এলাকার মধ্যে ব্রডব্যান্ড, ভিপিএন ও ভিস্যাট পরিষেবা সহ সব ধরনের ইন্টারনেট ও ডেটা পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত ও নিয়ন্ত্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ পরিষেবা সাময়িক স্থগিতকরণ বিধিমালা, ২০২৪-এর রুল ৩ অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করে মণিপুরের রাজ্যপাল ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা ৩০ মিনিট থেকে এই স্থগিতাদেশ কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। আদেশে জানানো হয়েছে, এটি একটি প্রতিরোধমূলক ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাঁচ দিনের জন্য বলবৎ থাকবে।
রাজ্যে কার্যরত সব ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাকে নির্দেশটি কঠোরভাবে মানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার আরও সতর্ক করেছে যে, নির্দেশ লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতির জরুরি বিবেচনায় আদেশটি একতরফাভাবে (এক্স-পার্টে) জারি করা হয়েছে এবং জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তা প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতাদেশের আগে উখরুলের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আশিস দাস (আইএএস) গৃহ দফতরের কমিশনারকে চিঠি লিখে জেলায় অবিলম্বে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের অনুরোধ জানান। তাঁর চিঠিতে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সেগুলি গুরুতর অশান্তির সৃষ্টি করেছে এবং জননিরাপত্তা ও শান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানো রুখতে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
গৃহ দফতরের এই আদেশে স্বাক্ষর করেছেন মণিপুর সরকারের কমিশনার-সচিব (গৃহ) এন অশোক কুমার। আদেশের অনুলিপি রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক, টেলিকম ও আইটি দফতরের প্রধানরা এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার নোডাল অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে তা অবিলম্বে কার্যকর করা যায়।
মণিপুরের একটি সংবেদনশীল পাহাড়ি জেলা হিসেবে পরিচিত উখরুলে অতীতেও একাধিকবার উত্তেজনার পরিস্থিতি দেখা গেছে। প্রশাসনিক আধিকারিকের বক্তব্য, অশান্তির সময় গুজব ছড়াতে সোশাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক এই ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত আবারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ইন্টারনেট শাট-ডাউনের ওপর রাজ্যের নির্ভরতার বিষয়টি সামনে এনেছে, যদিও দৈনন্দিন জীবন, তথ্যপ্রাপ্তি এবং জরুরি পরিষেবার ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।










