আর পাঁচটা দিনের সঙ্গে কোনও ফারাক নেই। হাওড়া স্টেশন চত্বরে মঙ্গলবার সকাল থেকে বাড়তি ভিড় চোখে পড়ল না। একই অবস্থা ফেরিঘাটেরও। ২১ জুলাইয়ের সেই চেনা ছবিটা উধাও। নেই কোন তৃণমূলের দলীয় গেট, ফেস্টুন অথবা পতাকা। বাজছে না লাউডস্পিকার। নেই কোনও অভ্যর্থনা মঞ্চও।
প্রতি বছর ২১ জুলাইয়ের আগের দিন থেকেই হাজার হাজার তৃণমূলকর্মী উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে কলকাতায় আসা শুরু করতেন। তাঁদের বিভিন্ন ক্যাম্পে রাতে থাকাখাওয়ার ব্যবস্থাও করা হত। হাওড়া স্টেশনে তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁদের স্বাগত জানানোর জন্য তৈরি হত অভ্যর্থনা মঞ্চ। গোটা হাওড়া স্টেশন এলাকা তৃণমূলের পতাকা এবং ফেস্টুন দিয়ে মুড়ে ফেলা হত।
কিন্তু এ বছর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। কার্যত খাঁ খাঁ করছে হাওড়া স্টেশন এবং ফেরিঘাট চত্বর। অন্যান্য বছর আজকের এই দিনটিতে ভোরবেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে চেপে হাওড়া স্টেশনে আসতেন। ফেরিঘাটে লঞ্চ ধরে কলকাতার শহিদ সমাবেশে যোগ দিতেন। আবার অনেকেই মিছিল করে ধর্মতলার উদ্দেশে রওনা দিতেন। এ বছর সকাল ৯টার পরও দেখা নেই তৃণমূল কর্মীদের। আর পাঁচটা দিনের সঙ্গে ২১ জুলাইয়ের কোনও ফারাক অন্তত চোখে পড়ল না হাওড়া স্টেশন এবং ফেরিঘাট চত্বরে।
অন্যদিকে, ২১ জুলাই সভায় আসা তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের। জেলা থেকে আসা কর্মী-সমর্থকদের জন্য ডিম-ভাতের আয়োজন করা হয়েছে। রাতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র আর কিছু গেস্ট হাউসে। প্রসঙ্গত, গতবারও তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের জন্য ঢালাও ব্যবস্থা ছিল। কলকাতার বিভিন্ন জায়গা দলের কর্মী-সমর্থকদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এবার অন্য ছবি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট তৃণমূলের তরফে কর্মীদের আয়োজন করা হয়নি বলে প্রাথমিক খবর। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এবার ২১ জুলাই ডিম-ভাত খাওয়ানোর রীতিও কালীঘাট তৃণমূলের থেকে কেড়ে নিল ঋতব্রত শিবির?
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শহিদ দিবস এককভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এবার রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ সম্পূর্ণ আলাদা। ২১ জুলাইয়ের শহিদ সমাবেশে তৃণমূলের মঞ্চ এবার দুই শিবিরে বিভক্ত। একদিকে ‘কালীঘাট’ তৃণমূল অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘আসল’ তৃণমূল। সভা করবে কংগ্রেসও। ফলে ২১ জুলাইকে ঘিরেই বাংলার রাজনীতি বহুমুখী লড়াইয়ের সাক্ষী হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, প্রদেশ কংগ্রেসও ময়দানে শহিদ মিনারের সামনে ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করবে। কংগ্রেসের তরফে প্রস্তুতিও হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু তৃণমূল শিবিরের দড়ি টানাটানি নিয়েই জোর চর্চা রাজনৈতিক মহলে। রবীন্দ্র সদনের ঢিল ছোড়া দূরত্বে তারামণ্ডলের সামনের রাস্তায় এবার ২১ জুলাই পালন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩ হাজারের বেশি লোক যাতে না হয়, সেই সংখ্যাও বেঁধে দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। দু’দিকের রাস্তা বন্ধ করা যাবে না, সেই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের থাকা-খাওয়ার কি কোনও ব্যবস্থা হয়েছে কালীঘাট তৃণমূলের তরফে? সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। পরে জানা যায়, মমতা শিবির সেভাবে এবার আর কাউকেই এনে রাখতে পারছে না, খাওয়ানো দূরস্ত। তবে সামান্য কিছু আয়োজনের ব্যবস্থা হয়েছে বলে অন্দরের খবর।
যদিও ‘আসল’ তৃণমূলের তরফে আয়োজন রাখা হয়েছে। জেলা থেকে আসা কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোয়াবিন, ডিমের ঝোল-ভাত খাবারের মেনুতে থাকছে। থাকার জন্য ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কিছু গেস্ট হাউস ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। বিশাল অঙ্কের ফান্ড কোথায় যাবে? সেই চর্চাও চলছে। ২১ জুলাই শহিদ দিবসও কার্যত ‘ছিনিয়ে’ নিল ঋতব্রত শিবির। ২১ জুলাইয়ের বহু চর্চিত ডিম-ভাতের আয়োজনও করলেন তাঁরাই।
কংগ্রেসের তরফে শহিদ মিনারে মঙ্গলবার কর্মসূচি রয়েছে। জেলা থেকে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকরাও আসছেন। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। সল্টলেকের যুবভারতী স্টেডিয়াম ও শহরের কিছু ধর্মশালায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। ধর্মশালায় নিরামিষ খাবারের নিয়ম, সেজন্য রাঁধুনি রেখে নিরামিষ সবজি ডাল আর ভাত খাওয়ানো হচ্ছে। যুবভারতী স্টেডিয়ামে খাবারের সঙ্গে ডিমের আয়োজন রয়েছে। আগামী কাল, মঙ্গলবার সকালেও খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে।










