পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত চর্চিত ও সংবেদনশীল দুটি বিধানসভা কেন্দ্র— পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে মঙ্গলবার কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উপনির্বাচন সম্পন্ন হলো। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুটি কেন্দ্রেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নন্দীগ্রামে ৭৯.৩৯ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
নিরাপত্তার কড়াকড়ি সত্ত্বেও দুটি কেন্দ্র থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, পুলিশের সাথে খণ্ডযুদ্ধ এবং বিরোধী দলগুলির তরফ থেকে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এদিনের সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে, যেখানে পুলিশের সাথে চরম উত্তপ্ত বাক্যবিন্যাসের পর আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমাযুন কবীরকে গ্রেফতার করা হয়।
রেজিনগরে ভোটগ্রহণ চলাকালীন পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন বিধায়ক হুমাযুন কবীরের সাথে নিজের দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত পুলিশ আধিকারিকদের তীব্র তর্কবিতর্ক হয়। হুমাযুন কবীর অভিযোগ করেন, পুলিশ প্রশাসন শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে কাজ করছে এবং সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তিনি স্থানীয় মানুষকে পুলিশের কথিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাঠি হাতে প্রতিবাদেরও আহ্বান জানান।
ঘটনার কিছু ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশকর্মীরা হুমাযুন কবীরকে জামা ধরে গাড়িতে তুলছেন। মুর্শিদাবাদের জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শচীন মক্কার স্পষ্ট জানান, হুমাযুন কবীর রেজিনগরের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা অনুমোদিত পোলিং এজেন্ট কোনটিই ছিলেন না, ফলে ভোটকেন্দ্রগুলির আশপাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে তাঁর উপস্থিতি নির্বাচনী বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। তাঁর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করা ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই ঘটনার পর কংগ্রেস প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহিত কাফি রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে পুরো ভোট প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান। একইসাথে সিপিআইএম (CPI-M) মোরাদিঘি অঞ্চলের মোড়াদিপুর ও দাদপুরের ১১২, ১১৩, ১১৪ ও ১২২ নম্বর বুথে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া এবং ভোটারদের আঙুলে জোরপূর্বক কালি লাগিয়ে ফেরত পাঠানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।
অন্যদিকে, নন্দীগ্রামেও দিনভর ছিল চাপা উত্তেজনার আমেজ। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান অভিযোগ করেন, পুলিশের মদতেই তাঁর পোলিং এজেন্টদের বুথে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, চক্রবেড়িয়া এলাকায় পুলিশ সাধারণ ভোটারদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। নন্দীগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় কংগ্রেস ও বিজেপির সমর্থকদের মধ্যেও দফায় দফায় বচসা ছড়ায়।
এ ছাড়া, সারবেড়িয়ায় সিপিআই এর এক পোলিং এজেন্টের ওপর শারীরিক হামলার খবর পাওয়া গেছে, যাঁর আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কংগ্রেসের তরফ থেকে রাজ্য মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে যে, খেজুরি সীমানা পার করে মোটরবাইকে আসা বহিরাগতরা নন্দীগ্রামে ঢুকে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, ভোটগ্রহণে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ নন্দীগ্রাম-১ ব্লক কংগ্রেস সভাপতিকেও আটক করেছে।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারী ও বিধায়ক হুমাযুন কবীরের ইস্তফার ফলেই এই দুটি আসন খালি হয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম দুই আসন থেকেই জয়লাভ করেছিলেন, পরবর্তীতে নিয়ম মেনে তিনি নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন। অন্যদিকে হুমাযুন কবীর রেজিনগর ও নওদা দুই আসন থেকেই জয়ী হয়ে রেজিনগর ইস্তফা দেন ও নওদা ধরে রাখেন।
নন্দীগ্রামে বিজেপির তরফে প্রয়াত দলীয় নেতা চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করা হয়েছে, যার ফলে লড়াইটি আবেগময় রূপ নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নাম প্রত্যাহার করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যৌথভাবে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে রেজিনগরে চতুর্মুখী লড়াই চলছে। সেখানে হুমাযুন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদ, বিজেপির সখারভ সরকার, তৃণমূলের রবিউল আলম চৌধুরী এবং কংগ্রেসের মোহাম্মদ আব্দুল্লাহিত কাফির মতো একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আসন্ন উপনির্বাচনের সার্বিক ফলাফলে সরবরাহের আগামী ৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে। সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচন কমিশন দুই কেন্দ্র মিলে মোট ৭১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছিল।










