ঢাকের বাদ্যি থেমে আসছে, মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে সিঁদুর খেলা। কারও চোখে আনন্দের রেশ, কারও চোখের কোণে জল। বিসর্জনের সুরে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের চারটে দিন। যে দিনগুলোর জন্য একটা গোটা বছর ধরে অপেক্ষা, সেই দিনগুলোই যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেল! উমাকে বিদায় জানানোর সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই মনখারাপের সুর চড়ছে বাঙালির ঘরে ঘরে। কিন্তু এই বিষাদের মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে একরাশ আনন্দের খবর। কারণ, আবার একটা বছরের অপেক্ষা হলেও ২০২৭ সালের দুর্গাপুজো আসতে কিন্তু খুব বেশি দেরি নেই! হাতে আর মাত্র ৩৪৫ দিন!
চার দিনের উৎসব, এবার বাড়তি পাওনা!
বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র কয়েকটা দিনের উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, নস্টালজিয়া, পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। পুজোর আগমনী সুর কানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। নতুন জামাকাপড় কেনা, প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে ঠাকুর দেখা—সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন যেন অন্য এক পৃথিবীতে বাস করে বাঙালি।
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কখনও বৃষ্টির চোখরাঙানি, কখনও আবার প্রচণ্ড গরমে নাজেহাল অবস্থা। তবুও উৎসবের আনন্দে কোনও খামতি ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করেই মণ্ডপে মণ্ডপে উপচে পড়েছে মানুষের ভিড়।
এবারের পুজোয় অবশ্য ক্যালেন্ডারের হিসাবেও ছিল বাড়তি চমক। সপ্তমী দু’দিন ধরে পালিত হওয়ায় উৎসবের দিনসংখ্যা বেড়েছিল। ফলে আনন্দ করার জন্য মিলেছিল বাড়তি একটা দিন। কিন্তু সময়ের নিয়মে সেই আনন্দের মুহূর্তও এখন অতীত। দশমী মানেই উমার বিদায়, আর বিদায় মানেই পরের বছরের জন্য নতুন করে দিন গোনা।
২০২৭ সালে কবে আসছেন মা দুর্গা?
মনখারাপের মাঝেই এবার একটু ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ রাখা যাক। কারণ, ২০২৬ সালের পুজো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গিয়েছে আগামী বছরের উৎসবের কাউন্টডাউন।
প্রথমেই আসছে মহালয়ার কথা। ২০২৭ সালে মহালয়া পড়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। মহালয়া মানেই পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনা এবং আকাশে-বাতাসে আগমনী সুরের ছোঁয়া। ভোরের অন্ধকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার মধ্য দিয়েই বাঙালির মনে শুরু হয় পুজোর প্রকৃত আবাহন।
এরপর অপেক্ষা পুজোর মূল দিনগুলোর।
২০২৭ সালের দুর্গাপুজোর সূচি অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার পড়ছে ষষ্ঠী। অর্থাৎ ওই দিন থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হবে দেবী দর্শনের উন্মাদনা। পরদিন, ৬ অক্টোবর, বুধবার সপ্তমী।
তবে এখানেই রয়েছে একটি বিশেষ বিষয়। ২০২৭ সালেও অষ্টমী তিথি দু’দিন ধরে পড়ছে। প্রথম অষ্টমী ৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার এবং দ্বিতীয় অষ্টমী ৮ অক্টোবর, শুক্রবার। এরপর ৯ অক্টোবর, শনিবার নবমী এবং ১০ অক্টোবর, রবিবার বিজয়া দশমী।
অর্থাৎ, আগামী বছরও পুজোর আনন্দ উপভোগ করার জন্য মিলবে পাঁচ দিনের সুযোগ! যদিও তিথি ও পুজোর আচার পালনের ক্ষেত্রে পঞ্জিকাভেদে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
দুর্গাপুজোর পরেই লক্ষ্মী, তারপর কালী!
বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডার কিন্তু দুর্গাপুজোতেই থেমে থাকে না। উমার বিদায়ের পরেই শুরু হয় মা লক্ষ্মীর আরাধনার প্রস্তুতি। ঘরে ঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলপনা আর ধন-সম্পদের দেবীর পুজো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সকলে।
২০২৭ সালে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পড়েছে ১৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। দুর্গাপুজোর আনন্দ কাটতে না কাটতেই তাই আবার উৎসবের আবহে মেতে ওঠার সুযোগ।
এরপর আসবে আলোর উৎসব দীপাবলি। ২০২৭ সালে কালীপুজোর দিন ২৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। অমাবস্যার অন্ধকার দূর করে আলোর সাজে সেজে উঠবে বাড়ি থেকে শহরের অলিগলি। প্রদীপ, আলো আর আতসবাজির উৎসব ঘিরে তৈরি হবে নতুন উন্মাদনা।
তার ঠিক তিন দিন পর, ৩১ অক্টোবর, রবিবার পালিত হবে ভাইফোঁটা। ভাই-বোনের সম্পর্কের মধুর বন্ধন উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে উৎসবের মরশুমে যোগ হবে আরও একটি আবেগঘন অধ্যায়।
বিষাদের মাঝেই নতুন আশার আলো!
আসলে বাঙালির কাছে বিজয়া দশমী কখনওই শুধুমাত্র শেষের নাম নয়। এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি। আজ যে মাকে সিঁদুর পরিয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে, চোখের জলে বিদায় জানানো হচ্ছে, তাঁকেই আবার বরণ করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন সকলে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন গুনতে গুনতে কেটে যাবে শীত, আসবে বসন্ত, তারপর গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা। আবার আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াবে, কাশফুল দুলবে নদীর ধারে। আর বাঙালির মনে বাজবে সেই চেনা আগমনী সুর।
তাই আজ মনখারাপ হোক, চোখে জল আসুক, তবুও অপেক্ষা থামবে না। কারণ, ২০২৭ সালের দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন ইতিমধ্যেই শুরু!
তাহলে আর দেরি কেন? ক্যালেন্ডারে তারিখগুলো চিহ্নিত করে রাখুন। উমা আবার আসবেন, আবার ঢাক বাজবে, আবার আলোয় ভরে উঠবে চারদিক। আর মাত্র ৩৪৫ দিনের অপেক্ষা—তারপরই ফিরে আসবে বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় উৎসবের সেই চেনা আনন্দ!










