সেপ্টেম্বরের শেষ তিন দিন দেশজুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন কর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলি। আগামী ২৮, ২৯ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর টানা তিন দিন ধর্মঘট চললে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখাভিত্তিক পরিষেবা বড় ধাক্কা খেতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর দেশের সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্কের শাখা স্বাভাবিকভাবে খোলা থাকবে। সাধারণত রবিবার ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকে। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ শনিবার হওয়ায় ওই দিনও ছুটি। তার পর রবিবার এবং পরবর্তী তিন দিন ধর্মঘট মিলিয়ে গ্রাহকদের টানা পাঁচ দিন শাখার পরিষেবা না-পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি এড়াতেই রবিবার ব্যাঙ্ক খোলার সিদ্ধান্ত।
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও ওই দিন শাখা, দফতর, এটিএম-সংযুক্ত শাখা এবং কারেন্সি চেস্ট পুরোপুরি চালু রাখার অনুমোদন দিয়েছে।
কেন তিন দিনের ব্যাঙ্ক ধর্মঘট (bank strike news)
ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়ন্স বা ইউএফবিইউ ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। সাতটি ব্যাঙ্ক ইউনিয়নের যৌথ মঞ্চ ইউএফবিইউয়ের দাবি, তারা দেশের প্রায় আট লক্ষ ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারের প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনগুলির বক্তব্য, ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী তাদের আওতায় রয়েছেন।
ধর্মঘটের নেপথ্যে মূলত চারটি দাবি রয়েছে—সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু রাখা। কর্মদক্ষতাভিত্তিক উৎসাহভাতা বা পিএলআই ব্যবস্থায় পরিবর্তন। পিএলআই নিয়ে সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং সর্বোপরি ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান।
তবে বর্তমান সংঘাতের প্রধান কারণ সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাঙ্কিংয়ের দাবি। ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, এই বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হওয়ার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন মিলছে না।
পাঁচ দিনের ব্যাঙ্কিং সপ্তাহের দাবি কী
বর্তমানে দেশের ব্যাঙ্কগুলি প্রতি মাসের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শনিবার বন্ধ থাকে। প্রথম ও তৃতীয় শনিবার শাখা খোলা থাকে। কোনও মাসে পঞ্চম শনিবার থাকলে সাধারণত সে দিনও ব্যাঙ্কে কাজ হয়।
কর্মী সংগঠনগুলির দাবি, মাসের সব শনিবার ব্যাঙ্ক বন্ধ রাখতে হবে। অর্থাৎ সরকারি দফতর ও অধিকাংশ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাঙ্কেও সোমবার থেকে শুক্রবার—সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ চালু করতে হবে।
তবে ইউনিয়নগুলি ব্যাঙ্কিং পরিষেবার মোট সময় কমিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে না। তাদের প্রস্তাব, সোমবার থেকে শুক্রবার প্রতিদিন কাজের সময় কিছুটা বাড়ানো হোক। তাতে শনিবারের কর্মঘণ্টা বাকি পাঁচ দিনে ভাগ হয়ে যাবে এবং গ্রাহকদের জন্য মোট ব্যাঙ্কিং সময় প্রায় একই থাকবে।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ব্যাঙ্ককর্মীদের বেতন সংশোধন সংক্রান্ত সমঝোতার সময় ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশন বা আইবিএ এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল বলে দাবি ইউনিয়নগুলির। পরে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি।
ইউএফবিইউয়ের বক্তব্য, আলোচনা এবং সমঝোতার পরেও পাঁচ দিনের ব্যাঙ্কিং চালুর বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি। সেই কারণেই ধর্মঘটের পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কর্মীরা।
কেন্দ্র অবশ্য জানিয়েছে, পাঁচ দিনের ব্যাঙ্কিংয়ের প্রস্তাব এখনও বিবেচনাধীন। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে গ্রাহকদের সুবিধা, আর্থিক বাজার, সরকারি লেনদেন এবং একাধিক অংশীদারের স্বার্থ জড়িত থাকায় সব দিক পর্যালোচনা করতে সময় লাগছে।
পিএলআই নিয়ে কেন আপত্তি
পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা পিএলআই হল ব্যাঙ্কের আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত উৎসাহভাতা। ২০২০ সালের বেতন সমঝোতার সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কোনও ব্যাঙ্কের মুনাফা ও সামগ্রিক আর্থিক ফল ভাল হলে কর্মীদের অতিরিক্ত উৎসাহভাতা পাওয়ার কথা।
সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন ব্যাঙ্ক অফিসারদের জন্য পিএলআই ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরে নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, সংশোধিত ব্যবস্থায় চতুর্থ গ্রেড এবং তার উপরের অফিসারদের আওতায় রাখা হলেও নিচের স্তরের অফিসারদের বাদ দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অফিসারদের মধ্যে এমন বিভাজন বৈষম্যমূলক বলে দাবি সংগঠনগুলির।
ইউনিয়নগুলি চায়, কোনও নতুন পিএলআই ব্যবস্থা কার্যকর করার আগে তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা হোক। উৎসাহভাতা কারা পাবেন এবং কীভাবে তা নির্ধারিত হবে, সেই নিয়মও স্বচ্ছ ও সমান হওয়া দরকার।
কোন ব্যাঙ্কে ধর্মঘটের প্রভাব বেশি পড়বে
ধর্মঘটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির শাখায়। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ইতিমধ্যে গ্রাহকদের সতর্ক করেছে।
আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্কের পরিষেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির কর্মীরা এই ধর্মঘটে সামগ্রিকভাবে অংশ নিচ্ছেন না বলে সেখানে প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। যদিও চেক ক্লিয়ারিং বা আন্তঃব্যাঙ্ক লেনদেনের ক্ষেত্রে পরোক্ষ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যে পরিষেবাগুলি ব্যাহত হতে পারে—ব্যাঙ্কের কাউন্টার থেকে নগদ জমা ও তোলা, চেক জমা ও ক্লিয়ারিং, ডিমান্ড ড্রাফট বা পে-অর্ডার তৈরি, অ্যাকাউন্ট খোলা বা বন্ধ করা, কেওয়াইসি সংক্রান্ত কাজ, পাসবুক আপডেট, ঋণ সংক্রান্ত নথি জমা ও অনুমোদনের কাজ, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, শাখানির্ভর সরকারি লেনদেন এবং ট্রেজারি ও বাজার সংক্রান্ত কিছু কাজ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে পর্যাপ্ত নগদ দিয়ে এটিএম ভর্তি রাখতে এবং যত বেশি সম্ভব জরুরি পরিষেবা সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রক।
উপিআই, এটিএম ও অনলাইন ব্যাঙ্কিং কি চলবে
ধর্মঘট হলেও গোটা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে না। ইউপিআই, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং এবং এটিএম সাধারণভাবে চালু থাকার কথা। তবে এটিএমে নগদের জোগান বা কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা হলে তা দ্রুত মেরামত করার ক্ষেত্রে ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় নগদ আগে থেকে তুলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রবিবার কোন কোন ব্যাঙ্ক খুলবে
২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার মূলত সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক স্বাভাবিকভাবে খোলা থাকবে। অর্থ মন্ত্রকের ঘোষণা অনুযায়ী, শুধু গ্রাহক পরিষেবার শাখাই নয়, ব্যাঙ্কের দফতর, এটিএম-সংযুক্ত শাখা এবং কারেন্সি চেস্টও চালু থাকবে।
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও জানিয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর তাদের সমস্ত শাখা খুলবে এবং স্বাভাবিক পরিষেবা দেবে। তবে সব বেসরকারি ব্যাঙ্ক রবিবার খুলবে কি না, তা পৃথক ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করতে পারে। বেসরকারি ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট, অ্যাপ অথবা শাখার বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া উচিত।
কেন ৩০ সেপ্টেম্বর নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ
৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাঙ্কগুলির অর্ধবার্ষিক হিসাব বন্ধের দিন। এই সময়ে ব্যাঙ্কগুলিকে আয়-ব্যয় মিলিয়ে দেখা, অনাদায়ী ঋণের সংস্থান, ট্রেজারি অপারেশন, শেয়ার ও বন্ড বাজারের হিসাব এবং বিভিন্ন আর্থিক সমন্বয়ের কাজ করতে হয়।
অর্ধবার্ষিক হিসাব বন্ধের দিন ধর্মঘট হলে তার প্রভাব শুধু সাধারণ গ্রাহকের উপর নয়, ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ হিসাব এবং বাজারের লেনদেনেও পড়তে পারে। সেই কারণেই তিন দিনের ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে ইউনিয়নগুলির কাছে আবেদন জানিয়েছে কেন্দ্র।
ধর্মঘটের আগে গ্রাহকদের কী করা উচিত
জরুরি শাখাভিত্তিক কোনও কাজ থাকলে ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবারের মধ্যেই তা সেরে ফেলা ভাল। বিশেষ করে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, চেক জমা, ডিমান্ড ড্রাফট, কেওয়াইসি, ঋণের নথি অথবা সময়সীমা নির্দিষ্ট কোনও সরকারি লেনদেন ফেলে না রাখাই নিরাপদ।
গ্রাহকদের জন্য কয়েকটি জরুরি পরামর্শ—পর্যাপ্ত নগদ আগে থেকে তুলে রাখুন, চেক জমা দেওয়ার কাজ রবিবারের মধ্যে সেরে ফেলুন, প্রয়োজনীয় ইউপিআই ও নেট ব্যাঙ্কিং সীমা পরীক্ষা করুন, গুরুত্বপূর্ণ অর্থ স্থানান্তরের সুবিধাভোগীর তথ্য আগে থেকেই যোগ করুন, ব্যাঙ্কের অ্যাপ ও মোবাইল নম্বর সচল আছে কি না দেখে নিন, সন্দেহজনক ধর্মঘট-সংক্রান্ত লিঙ্ক বা প্রতারণামূলক বার্তায় ক্লিক করবেন না।
২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি
তিন দিনের ধর্মঘটেই বিরোধ শেষ হচ্ছে না। ইউএফবিইউ জানিয়েছে, পাঁচ দিনের ব্যাঙ্কিং সপ্তাহ-সহ গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলির সমাধান না হলে ২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হতে পারে।
সরকার ও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এখনও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। পাঁচ দিনের ব্যাঙ্কিংয়ের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, প্রস্তাবটি খারিজ করা হয়নি; এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। কিন্তু ইউনিয়নগুলির প্রশ্ন, আইবিএর সম্মতি এবং লিখিত সমঝোতার পরেও বাস্তবায়নের জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
২৮ সেপ্টেম্বরের আগে নতুন করে সমঝোতা না হলে তিন দিনের ধর্মঘট প্রায় অনিবার্য। ফলে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে উঠছে ২৭ সেপ্টেম্বর—সাধারণ রবিবার হলেও সে দিনই ধর্মঘটের আগে জরুরি শাখাভিত্তিক কাজ মেটানোর শেষ সুযোগ।










