সাতসকালে মুর্শিদাবাদে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তিন স্কুলপড়ুয়া-সহ মোট চার জনের। রেলগেট খোলা ছিল। হুড়মুড়িয়ে চলে এল ট্রেন। কোনও রকম বাধা না পেয়ে তখনই লাইন পেরোচ্ছিল একটি স্কুলগাড়ি। লাইনের উপর থাকা ওই স্কুলগাড়িকে পিষে দিয়ে চলে গেল ডাউন লোকাল। শুক্রবার সকালে মুর্শিদাবাদ জেলার আজিমগঞ্জ-কাটোয়া শাখার কর্ণসুবর্ণ স্টেশন এবং গোবিন্দপুর রেলগেটের মাঝে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় তিন স্কুলপড়ুয়া-সহ মোট চার জনের মৃত্যু হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরও চার পড়ুয়া এবং গাড়ির চালককে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
স্থানীয় এবং পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৭টা নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে। ডাউন লাইন ধরে তখন আসছিল নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ঠিক তার আগেই আপ লাইন ধরে হাওড়াগামী নবদ্বীপ এক্সপ্রেস চলে যাওয়ার পর গোবিন্দপুর রেলগেটটি আর বন্ধ করা হয়নি। গেট খোলা দেখেই বেশ কয়েক জন স্কুলপড়ুয়াকে নিয়ে গাড়িটি রেললাইন পার হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল এবং সরাসরি ধাক্কা মারে স্কুলভ্যানটিতে।
ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায় স্কুলগাড়িটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তিন স্কুলপড়ুয়া এবং এক স্থানীয় বাসিন্দার। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় বহরমপুর থানার পুলিশ। গুরুতর জখম অবস্থায় আরও চার পড়ুয়া এবং ওই গাড়ির চালককে উদ্ধার করে দ্রুত বহরমপুরে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট পাঁচ জন। তাঁদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গাড়িতে মোট ১০ জন পড়়ুয়া ছিল বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় রেলের ভূমিকা ও গেটম্যানের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ নিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, গেটম্যানের অসতর্কতাতেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। কারও কারও আবার দাবি, গেটম্যান নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। তাই নির্দিষ্ট সময়ে লেভেল ক্রসিংয়ের গেট বন্ধ করেননি তিনি।
ঘটনার পরই তৎপর পূর্ব রেল। যথাযথ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রেলের তরফে। ইতিমধ্যেই লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় গেটম্যান এবং সুপারভাইজারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
কী জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ?
পূর্ব রেল জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ তথ্য তাদের কাছে এসে পৌঁছয়নি। তবে, ইতিমধ্যেই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূর্ব রেলের তরফে বিশেষ টিমও পাঠানো হচ্ছে ঘটনাস্থলে। রেল জানিয়েছে, সিগন্যালের কোনও সমস্যা ছিল না। সেক্ষেত্রে গেটম্যানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, বহরমপুরে কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝে প্রথমে একটি আপ ট্রেন যায়। গেট তুলে দেওয়ার পর ওই পুলকার যেতেই ট্র্যাকে চলে আসে নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেন। সেইসময় কোনও গেটম্যান ছিলেন না বলেই দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, এই ধরনের রেলগেট যেগুলি মূল ম্যানুয়ালি অপারেট করা হয়, সেগুলিকে ইন্টারলকিং গেট বলা হয়। এক্ষেত্রে গেটম্যান কোথায় ছিল, আদৌ ছিল কি না, থাকলে কোথায় ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিগন্যাল ছিল না বলেও অনেকে অভিযোগ তুলেছেন। তবে, রেলের তরফে জানানো হয়েছে, সিগন্যালের কোনও সমস্যা ছিল না। সিগন্যাল মেনেই ট্রেন এসেছে। এখানে গেট ম্যানের ভূমিকাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। জানা গিয়েছে, রেলের নির্দেশের পরই সকালে এডিআরএম-এর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্তকারী দল হাওড়া স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয়। পূর্ব রেলের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেন, এসব ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে রেল। গোটা ঘটনার তদন্ত করে দেখা হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে।
বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র জানিয়েছেন, এতগুলো পড়ুয়ার মৃত্যু মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। কী কারণে এতগুলো স্কুল পড়ুয়ার প্রাণ গেল, তা রেলের তদন্ত করে দেখা উচিৎ। অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, রেলে কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।










