গঙ্গার প্রবহমান ধারায় একটি চকচকে ধূসর রঙের কায়া জল ঠেলে বাতাসে লাফিয়ে ওঠে। তার পর পলক ফেলার আগেই ফের নদীর গভীরতায় অদৃশ্যে হারিয়ে যায়। এই রোমাঞ্চকর দৃশ্য ভারতের একমাত্র ভাগলপুরের সুলতানগঞ্জ থেকে কাহালগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত ‘বিক্রমশিলা গাঙ্গেয় ডলফিন অভয়ারণ্য’-এর।
পর্যটকদের কাছে জলের ওপর ভারতের এই জাতীয় জলচর প্রাণীর এই খেলাধুলো যতটা আনন্দের ও রোমাঞ্চের, বিশেষজ্ঞদের কাছে নদীর ভেতরের প্রকৃত পরিস্থিতি কিন্তু ততটাই উদ্বেগের। অভয়ারণ্যে বর্তমানে এই সুন্দর ডলফিনদের বাস থাকলেও তাদের অস্তিত্বের ওপর বিপদের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক তথ্য ও বন বিভাগের নজরদারি রিপোর্ট অনুযায়ী, সুলতানগঞ্জ থেকে কাহালগাঁও পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ডলফিনের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২০০-র কাছাকাছি এসে থমকে গেছে। তবে এই স্থায়িত্ব মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়, কারণ এর পেছনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক দুটি প্রবণতা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ডলফিনের অনুপাতে আশঙ্কাজনক পতন নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি গঙ্গার এই অংশে নতুন শিশুর জন্ম ও বংশবৃদ্ধির হারও থমকে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নতুন বাচ্চার জন্ম না হয় বা তারা বেঁচে না থাকে, তবে বর্তমান প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা বার্ধক্যে পৌঁছালে ডলফিনের সামগ্রিক সংখ্যায় হঠাৎ ধস নামতে পারে। এই গুরুতর পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, গঙ্গা গবেষক এবং পরিবেশবিদরা।
প্রখ্যাত ডলফিন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. সুনীল চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, “পুরুষ ডলফিনের সংখ্যা কমে যাওয়া সরাসরি তাদের প্রজনন চক্রকে প্রভাবিত করছে। ডলফিন অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী। যতক্ষণ না তারা নিজেদের অনুকূল শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে, ততক্ষণ তাদের সংখ্যায় স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটা অসম্ভব। নতুন বাচ্চার সংখ্যা না বাড়ার অর্থ হলো— প্রজননের পর হয়তো গর্ভপাত ঘটছে অথবা জন্মানোর পর অতিরিক্ত দূষণ ও শব্দের কারণে তাদের মৃত্যু হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, মৎস্যজীবীদের ব্যবহৃত নিষিদ্ধ নাইলনের ‘কারেন্ট জাল’ ডলফিনদের জন্য মারাত্মক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই জালে আটকে গিয়ে জলের ওপরে উঠে শ্বাস নিতে না পেরে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাচ্ছে বহু ডলফিন। এছাড়া গঙ্গায় বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলফিন মূলত ‘ইকোলোকেশন’ বা শব্দতরঙ্গের ওপর নির্ভর করে নিজেদের পথ নির্দেশ করে এবং শিকার ধরে। জলের তলার তীব্র শব্দ তাদের বধির ও দিকভ্রান্ত করে তুলছে, যার ফলে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপে ভুগছে প্রাণীগুলি।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে বন বিভাগ ও স্থানীয় একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যাপক সচেতনতা অভিযান শুরু করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী গ্রাম ও মৎস্যজীবী এলাকাগুলিতে নিয়মিত আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে। স্থানীয় যুবকদের ‘ডলফিন মিত্র’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যারা অবৈধ শিকার ও বিপজ্জনক জালের ব্যবহারের ওপর নজর রাখছেন। মৎস্যজীবী সমাজকে বোঝানো হচ্ছে যে, ডলফিন হলো গঙ্গার সুস্থতার মাপকাঠি বা থার্মোমিটার। ডলফিন সুরক্ষিত থাকলে নদীতে মাছের সংখ্যাও পর্যাপ্ত থাকবে। এর পাশাপাশি নাইলনের জালের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী সুতোর জাল ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে তাঁদের।
উল্লেখ্য, ভাগলপুরের গঙ্গায় ডলফিনের এই জগৎ দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত, শুধু সরকারি অভিযানে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নদীতে জলের ন্যূনতম স্তর বজায় রাখা, পলি পরিষ্কার এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের জাতীয় জলচর প্রাণীর এই রোমাঞ্চকর জগৎ সুরক্ষিত থাকবে না। সময় থাকতে সচেতন না হলে আগামী প্রজন্মকে এদের এই নান্দনিক খেলা কেবল বইয়ের পাতায় কিংবা ভিডিওতেই দেখতে হবে।










