পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বারবার জানিয়ে আসছে নতুন রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গত কয়েক মাসে দেশ-বিদেশের শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—দীর্ঘদিনের শিল্পখরা কাটিয়ে বাংলাকে আবারও বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত করা। সেই প্রেক্ষাপটেই দুর্গাপুর থেকে কেন্দ্রীয় ভারী শিল্প ও ইস্পাত মন্ত্রী এইচ. ডি. কুমারস্বামীর একাধিক ঘোষণা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
সোমবার দুর্গাপুর হাউসে আয়োজিত ‘স্টিল কনসাল্টিভ কমিটি’র বৈঠকে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভারতের ইস্পাত শিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা সেইলের দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট (ডিএসপি)-এর সম্প্রসারণ, মিশ্র ইস্পাত কারখানার পুনরুজ্জীবন এবং ইস্কো স্টিল প্ল্যান্টের উৎপাদন বৃদ্ধির মতো একাধিক প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
২০৩০ সালের লক্ষ্য—৩০০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদন
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত উৎপাদক দেশ। তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশীয় উৎপাদন আরও বহুগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এইচ. ডি. কুমারস্বামী জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৩০০ মিলিয়ন টন (৩০০ মেট্রিক মিলিয়ন টন) ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলা।
মন্ত্রী বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল, প্রতিরক্ষা, আবাসন, অটোমোবাইল এবং উৎপাদন শিল্পের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই প্রয়োজন মেটাতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।
দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে বড় সম্প্রসারণ
বর্তমানে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২.২ মিলিয়ন টন। কিন্তু বাস্তবে গত প্রায় দেড় থেকে দুই বছর ধরে কারখানাটি সেই ক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। এই পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ডিএসপির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বছরে ৪.০৮ মিলিয়ন টনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যেই সেই সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত দিয়ে এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের শিলান্যাস হোক, সেই ইচ্ছাও প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না, আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন যন্ত্রপাতি এবং কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।
দুর্গাপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক শিল্প প্রতিষ্ঠান মিশ্র ইস্পাত কারখানা বহু বছর ধরেই কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। একসময় দেশের প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও বিশেষ শিল্পে প্রয়োজনীয় বিশেষ ধরনের ইস্পাত উৎপাদনের জন্য এই কারখানার বিশেষ পরিচিতি ছিল।
একসময় এই কারখানার বিলগ্নীকরণের পরিকল্পনা থাকলেও কেন্দ্র এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা সেইলের অধীনে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের সঙ্গে এই কারখানাকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন শিল্পপতি, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।
সরকারের দাবি, উৎপাদনমুখী শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, লজিস্টিকস, বন্দর, ইস্পাত ও উৎপাদন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুর, আসানসোল, খড়্গপুর, হলদিয়া এবং উত্তরবঙ্গের শিল্পাঞ্চলগুলিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দুর্গাপুরকে ঘিরে ঘোষিত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে তা রাজ্যের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হতে পারে।
দুর্গাপুর থেকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রীর ঘোষণাগুলি শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি শিল্প কৌশলেরও অংশ। ২০৩০ সালের ৩০০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডিএসপির সম্প্রসারণ, মিশ্র ইস্পাত কারখানার পুনর্জাগরণ, ইস্কোর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শ্রমিক নিরাপত্তায় জোর—সব মিলিয়ে বাংলার শিল্প মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলছে। এখন নজর থাকবে ঘোষণাগুলি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায় এবং সেগুলি রাজ্যের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।










